সময়ের সাথে সাথে মানব সমাজে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এসেছে, একটি ঘুণে ধরা পুরাতন সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে নতুন সমাজব্যবস্থায় পদার্পন করেছে মানুষ। সভ্যতা এগিয়ে গেছে নিজস্ব গতিতে, আর এই গতিশীলতার জ্বালানী যোগায় চিন্তায় অগ্রসর মানুষ। এরা হাতুড়ি দিয়ে জীর্ন শ্যাওলা ধরা পুরাতন দেয়াল ভাঙ্গেন, সবুজ ঘাসে ভোরবেলায় মুক্তোর মতো উজ্বল শিশির আনবেন বলে।
সভ্যতার এই নিয়ত ভাঙ্গাগড়া, সাহিত্যেও বিদ্যমান কেননা তা সভ্যতারই অংশ। বাংলা কবিতাও এই ভাঙ্গাগড়ার বাইরে নয়। প্রায় দেড় হাজার বছরের পথ পরিক্রমায়, আবহমান বাংলা কবিতা বর্নিল রঙে সাজিয়েছে শিল্পের ডালা। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হয়েছে সমসাময়িক, পরিবর্তন এসেছে বাক্যে, ছন্দে, শব্দে। কবিরাই এর অগ্রসৈনিক, আবহমান বাংলার নিয়ত পরিবর্তনের সাথে তাল রেখে বিভিন্ন সময়ে লিখে গেছেন, শ্যামল বাংলার কথা হাসি-কান্না-ক্ষোভ অথবা দ্রোহের কথা, পরাধীনতার কথা।
চণ্ডীদাস (১৩৭০-১৪৩৩) থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ(১৮৯৯-১৯৫৪), বাংলা কবিতায় এদের প্রত্যেকেই তাদের মেধা, মনন, দর্শন, চিন্তার মৌলিক সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন প্রগাঢ় সৃজনশীলতায়। কবিতার অক্ষরে তারা প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলার সমাজপরিবর্তনের এক একটি ঐতিহাসিক বাঁকের। আর তাই কবিতায়ও এসেছে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, এসেছে নতুন ভঙ্গিমা।
দেশভাগের উত্তাল সময়ে উত্থান ঘটে এমনই এক ক্ষণজন্মা কবি শহীদ কাদরীর(১৯৪২-২০১৬)। দেশভাগের পটভূমিতে বসে রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে আধুনিক নাগরিক কবিতার উত্থানে রেখেছিলেন গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা। তাঁর লেখার পরিমাণ খুব বেশী না, কিন্তু মৌলিকতার দিক দিয়ে অনন্য। তাঁর ৪টি কাব্যগ্রন্থে রয়েছে ১৫০ এর মতো কবিতা, দুইটি সংকলন, কলামও লিখেছেন কিছুদিন। তিনি তাঁর শব্দের হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছেন জীর্ণ সময়ের দেয়ালে। তিনি লিখেছেন,
‘জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন
থেকে নেমে—
সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে
উগ্রে দিল যেন
দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে’…
নিভে যাওয়া ল্যাম্পোস্টের নিচে জমে উঠা শতাব্দির নাগরিক আঁধারকে, দৃঢ় শৈশব দিয়ে আঘাত করেছেন তিনি। কবিতায় তুলে এনেছেন, শব্দে ছবি এঁকেছেন, নাগরিক অন্ধ গলিপথের।
আবার প্রবল প্রেমে আশ্বাস দিয়েছেন প্রিয়তমাকে। লিখেছেন,
‘ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা’।
দীর্ঘ বিরতি দিয়ে প্রকাশ করেছেন তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ, উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা (১৯৭৪), কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই (১৯৭৮), আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯)। লিখেছেন বেশকিছু কলাম, এবং প্রবন্ধ। এগারো বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে তিনি ‘পরিক্রমা’ শিরোনামে তার প্রথম কবিতা রচনা করেন, যা মহিউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘স্পন্দন’ কাগজে ছাপা হয়েছিল। ২৫ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার ছাপা হয়। নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সন্নিবেশ ঘটিয়ে বাংলা কবিতাকে নতুন রুপে সাজান। সেসব কবিতায় তার সাহসী শব্দচয়ন যে উন্মাদনার জন্ম দিয়েছিল, তার রেশ এখনো বিদ্যমান।
শহীদ কাদরী ছিলেন একজন পুরোদস্তুর নাগরিক কবি। শৈশব কেটেছে কোলকাতায়, দেশভাগের ডামাডোলে ভাগ হয় শৈশব। চলে আসেন ঢাকায়। বস্তুত তিনি গ্রামীণ জীবনের স্বাদবঞ্চিত একজন আধুনিক নাগরিক কবি। এ কারণে তাঁর কাব্যভাষাও হয়ে উঠেছে ভীষণরকম শহুরে। তিনি বলেছেন, ‘কাব্যভাষা তৈরির জন্য অভিজ্ঞতা লাগে, বই পড়ে নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি হয় না।’
আজন্ম নাগরিক কবি শহীদ কাদরী, তিরিশোত্তর আধুনিকতাকে ধারণ করেছেন আপন জীবনবোধে। একদিকে তিনি নগর জীবনের সুখ-দুঃখ-একাকিত্বকে ভাষা, ভঙ্গী, বক্তব্যের মহিমায় অম্লান করেছেন, অন্যদিকে সেই তিনিই বিস্বাদ-নিষ্ঠুর নগরের উপাখ্যান লিখে গেছেন তাঁর কবিতায়।
তিনি লিখেছেন,
“আমি করাত-কলের শব্দ শুনে মানুষ।
আমি জুতোর ভেতর, মোজার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ।’
প্রসঙ্গত, শহীদ কাদরীর বাক্যচর্চা ছিলো নেপথ্যভূমিতে, পাঠকের নজরে কিছুটা কুহেলি ছুঁইয়ে তাঁর আবডালের বাক্যবিন্যাস, আর তাঁর কবিসত্বার পূর্ণতা সেখানেই। সাতচলিস্নশ-উত্তর কবিতাধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সঞ্চারিত করে কবিতার রূপ বদলে যাঁরা ছিলেন কারিগর, শহীদ কাদরী তাঁদের অন্যতম। ইতিহাস, ঐতিহ্য, ছন্দ, অলংকরণ অর্থাৎ কোনোকিছুর আধিক্য তাঁর লেখায় না পেলেও, তাঁর কবিতার সাজগোজে আছে ঈর্ষণীয় আভিজাত্য। মেদহীন কংক্রিটে, নিখুঁত তুলির আঁচড়ে গড়ে তুলেছেন তাঁর কাব্যের নাগরিক দালান। আর তাই তরুণদের ভিতর তুমুল জনপ্রিয় তিনি।
কবি বাংলার নাগরিক ঋতুবদলকে কখনো উচ্ছ্বাসে ভাসিয়েছেন, কখনও ভিজিয়েছেন তুমুল বিষাদে।
তিনি লিখেছেন,
‘শীতার্ত নিঃস্বতায় কিছুই বাঁচে না যেন,……
নিঃশেষে পান করে নিঃস্বার্থ মাটি
লতা-গুল্ম গাছ কাক শালিক চড়ুই
এমনই অসহায় গর্তের দেয়ালের জীব।’
এই নিষ্ঠুর নাগরিক বিকেলে, কবি শহীদ কাদরী চির অভিমানী। সাতচল্লিশের দাঙ্গা বুকে নিয়ে ঢাকায় পা রেখেছিলেন দুরন্ত শৈশবে, তারপর থেকে ভাঙ্গনের জলোচ্ছ্বাসে ভেসেছেন, এই বাংলার প্রত্যাকটি নাগরিক সুখদুঃখের অংশীদার কবি শহীদ কাদরী।আর তাই হয়তো অভিমানে নিমগ্ন কবি নিরবে প্রয়ান করেছেন বিদেশের মাটিতে, সুদূর নিউ ইয়র্কে ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট। কবি দুরন্ত শৈশবেই ছিলেন নৈঃশ্বব্দের মতো একা, তিনি লিখেছেন,
এবং আরো একজনের চোখে দেখি
লক্ষ সূর্যের আসা-যাওয়া এবং সেও একা
আমারই আত্মার মত
প্রাঙ্গণের তরুণ কুকুর!
